মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব আর একাকীত্বের এক অসাধারণ গল্প। পড়ুন ‘অচেনা গন্তব্যের যাত্রী’ এবং জীবনের নতুন মানে খুঁজুন।
অচেনা গন্তব্যের যাত্রী: একটি জীবনের গল্প
শহরের কোলাহল ছাপিয়ে ট্রেনের বাঁশিটা যখন বেজে উঠল, রাত তখন প্রায় বারোটা। স্টেশনের চারপাশটা কুয়াশায় ঢাকা। আরমান সাহেব বেঞ্চের এক কোণায় বসে আছেন। তার হাতে একটা পুরনো চামড়ার ব্যাগ, যার রং চটে গিয়ে তামাটে হয়ে গেছে। এই ব্যাগটা তার দীর্ঘ ত্রিশ বছরের চাকরি জীবনের সঙ্গী। আজ তিনি অবসরে যাচ্ছেন, কিন্তু বাড়ি ফেরার তাড়া তার চোখেমুখে নেই।
স্মৃতির জানলা
আরমান সাহেব জানালার ধারের সিটটায় বসলেন। ট্রেন চলতে শুরু করতেই জানালার বাইরে অন্ধকার গ্রামগুলো পেছনের দিকে ছুটতে লাগল। তার মনে পড়ে গেল ৩০ বছর আগের কথা। যখন তিনি প্রথম এই শহরে এসেছিলেন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে। তখন তার পরনে ছিল সাধারণ একটা সুতির পাঞ্জাবি আর চোখে ছিল আগামীর আকাশ ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা। আজ সব আছে, কেবল সেই আকাঙ্ক্ষাটুকু নেই।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, জীবনটা আসলে একটা ট্রেনের মতোই। স্টেশনে স্টেশনে মানুষ নামে আর ওঠে, কিন্তু শেষ গন্তব্য পর্যন্ত খুব কম মানুষই সাথে থাকে। তার স্ত্রী সুরাইয়া মারা গেছেন গত পাঁচ বছর হলো। ছেলেটা এখন প্রবাসে থিতু হয়েছে। বড় বাড়িটা এখন কেবল আসবাবপত্রের গুদামঘর।
অচেনা সহযাত্রী
মাঝপথে এক যুবক এসে তার সামনের সিটে বসল। ছেলেটার হাতে একটা গিটার আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা। আরমান সাহেবকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে ছেলেটা হেসে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, কোথায় যাবেন?” আরমান সাহেব একটু ম্লান হেসে বললেন, “যেখানে শেষ স্টপেজ।” By Google
ছেলেটা গিটারের তারে একটা টুং করে শব্দ তুলে বলল, “জীবনটাও তো তাই, তাই না চাচা? আমরা সবাই শেষ স্টপেজের খোঁজে ছুটি, কিন্তু মাঝখানের স্টেশনগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভুলে যাই।” আরমান সাহেব চমকে উঠলেন। এই বয়সে এসে এক তরুণের মুখে জীবনের এত বড় সত্য শুনে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
হারানো দিনের গান
গল্পে গল্পে রাত বাড়তে লাগল। যুবকটি জানাল তার নাম নীল। সে একজন ভবঘুরে শিল্পী। পাহাড় আর নদী তার ঠিকানা। আরমান সাহেব নিজের জীবনের না বলা অনেক কথা নীলকে বলতে শুরু করলেন। কীভাবে তিনি দিনরাত এক করে পরিশ্রম করে বাড়ি বানিয়েছেন, ছেলেকে বড় করেছেন, কিন্তু নিজের জন্য এক মুহূর্ত সময় পাননি।
নীল বলল, “চাচা, আপনি তো কেবল দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু বাঁচেননি। আগামীকাল যখন সূর্য উঠবে, তখন থেকে নিজের জন্য বাঁচা শুরু করুন।” এই কথাটি আরমান সাহেবের মনের ভেতর এক গভীর আলোড়ন তৈরি করল। তিনি বুঝতে পারলেন, অবসরের পর জীবন শেষ হয়ে যায় না, বরং এক নতুন জীবনের শুরু হয়।
অচেনা গন্তব্যের যাত্রী: একটি জীবনের গল্প
শৈশবের সেই ধূলোমাখা দিনগুলো
আরমান সাহেব যখন ট্রেনের জানালায় মাথা রাখলেন, তার মনে পড়ল গ্রামের সেই মেঠো পথ। তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক, যার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বড় অফিসার বানাবেন। সেই স্বপ্নের বোঝা কাঁধে নিয়ে আরমান সাহেব কত রাত লণ্ঠনের আলোয় পড়াশোনা করেছেন। আজ যখন তিনি বড় অফিসার হয়ে অবসরে যাচ্ছেন, তখন তার সেই জীর্ণ কুটির আর বাবা-মা কেউ নেই। এই যে শূন্যতা, এটাই বোধহয় জীবনের আসল পাওনা। তিনি ভাবলেন, আমরা যখন ছোট থাকি তখন বড় হওয়ার জন্য ছটফট করি, আর বড় হলে শৈশবে ফেরার জন্য কাঁদি। জীবনের এই বৈপরীত্যই মানুষকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়।
কর্মজীবনের কঠিন সংগ্রাম
শহরে আসার পর প্রথম কয়েকটা বছর ছিল বিভীষিকার মতো। ছোট একটা মেসে তেরোজন মানুষের সাথে থাকা, ডাল-ভাতের সংস্থান করতে টিউশনি করা—সবই আজ চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠছে। সুরাইয়ার সাথে যখন বিয়ে হলো, তখন তাদের সম্বল বলতে ছিল একটা ট্রাঙ্ক আর কিছু স্বপ্ন। সুরাইয়া কখনো অভিযোগ করেনি। বরং অভাবের দিনেও সে হাসিমুখে আরমান সাহেবের পাশে দাঁড়িয়েছে। আজ এই ট্রেনের এসি কামরায় বসে আরমান সাহেব অনুভব করছেন, সেই অভাবের দিনগুলোর ভালোবাসাই ছিল আসল ঐশ্বর্য। আজকের এই বিলাসিতা কেবল একাকিত্ব বাড়িয়েছে। Reddit
ছেলের প্রবাস জীবন ও একাকীত্বের দহন
আরমান সাহেবের একমাত্র ছেলে আদনান এখন কানাডায়। তাকে মানুষের মতো মানুষ করতে আরমান সাহেব নিজের সব শখ বিসর্জন দিয়েছেন। তাকে দামী স্কুলে পড়ানো, দামী পোশাক কিনে দেওয়া—সবই করেছেন। কিন্তু বিনিময়ে আজ তিনি কী পেয়েছেন? আদনান এখন বছরে একবার ফোন করে জিজ্ঞেস করে, “বাবা কেমন আছো?” ব্যস, ওইটুকুই। আরমান সাহেব বুঝতে পেরেছেন, সন্তানদের আমরা আগামীর জন্য তৈরি করি ঠিকই, কিন্তু তারা যখন ডানা মেলে ওড়তে শেখে, তখন তারা পেছনের আকাশটা ভুলে যায়। এটি কোনো অভিযোগ নয়, বরং এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা যা প্রতিটি মা-বাবাকেই এক সময় মেনে নিতে হয়।
নীলের সাথে সেই গভীর আলোচনা
ট্রেনের সেই তরুণ সহযাত্রী নীল আবার গিটার হাতে নিল। সে একটা পুরনো লোকগীতি গাইতে শুরু করল। গানের প্রতিটি শব্দ যেন আরমান সাহেবের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছিল। নীল বলতে লাগল, “চাচা, জানেন আমি কেন ঘর ছেড়েছি? আমার বাবা চাইতেন আমি ইঞ্জিনিয়ার হই, কিন্তু আমার মন পড়ে থাকত এই গিটার আর অজানার উদ্দেশ্যে। আমি হয়তো সফল হইনি সমাজের চোখে, কিন্তু আমি প্রতিদিন শান্তিতে ঘুমাই।” আরমান সাহেব বুঝলেন, সাফল্যের সংজ্ঞা আসলে আপেক্ষিক। কেউ অট্টালিকায় থেকেও অসুখী, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে থেকেও পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। Netflix
অচেনা গন্তব্যের যাত্রী
শেষ স্টেশনের প্রতীক্ষায়
ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। ট্রেনের গতি কিছুটা কমে এসেছে। আরমান সাহেব তার ব্যাগটা শক্ত করে ধরলেন। তার মনে হলো, অবসরের এই জীবনটা আসলে এক নতুন সুযোগ। তিনি ঠিক করলেন, গ্রামে ফিরে গিয়ে সেই পুরনো ভিটেয় একটা ছোট পাঠাগার করবেন। যে সময়টুকু তিনি নিজের জন্য পাননি, এখন সেই সময়টুকু তিনি বিলিয়ে দেবেন গ্রামের শিশুদের মাঝে। মৃত্যু আসার আগে অন্তত একবার তিনি নিজের মতো করে বাঁচতে চান। ট্রেনটা যখন স্টেশনে থামল, আরমান সাহেব এক নতুন মানুষ হিসেবে নিচে নামলেন। তার চোখে এখন আর একাকিত্ব নেই, বরং এক নতুন শুরুর সতেজতা আছে।



