তারাবির নামাজের নিয়ম, গুরুত্ব ও ফজিলত । পবিত্র রমজান মাস ইবাদত ও বন্দেগির মাস। এই মাসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো তারাবির নামাজ। এ নামাজ রমজান মাসের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন বান্দাদের জন্য এক বিশাল নেয়ামত।
আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা তারাবির নামাজের নিয়ম, নিয়ত, ফজিলত এবং এর রাকাত সংখ্যা নিয়ে ইসলামের সঠিক নির্দেশনাগুলো তুলে ধরব।
তারাবির নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব
তারাবির নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। এটি নারী ও পুরুষ সকলের জন্য অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
“যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াব হাসিলের আশায় রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল (তারাবির নামাজ) আদায় করবে, আল্লাহ তাআলা তার পূর্ববর্তী জীবনের সব ছোট গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
অন্য একটি হাদিসে এসেছে, তারাবির নামাজ পড়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পায় এবং সারারাত ইবাদতের সওয়াব লাভ করে যদি সে ইমামের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত নামাজটি আদায় করে।
তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা
আমাদের দেশে সাধারণত ২০ রাকাত তারাবি পড়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম, বিশেষ করে হযরত ওমর (রা.)-এর সময় থেকে আজ পর্যন্ত মক্কা ও মদিনার হারামাইন শরিফে ২০ রাকাত তারাবিই আদায় করা হচ্ছে। তবে এটি ২ রাকাত করে আদায় করা সুন্নাহ। আপনি চাইলে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী ৮ রাকাত বা ২০ রাকাত পড়তে পারেন, তবে ২০ রাকাত পড়া অধিক সওয়াব ও সুন্নাহর সঠিক প্রতিফলন। Reddit
তারাবির নামাজের নিয়ত
নামাজের জন্য অন্তরের সংকল্পই হলো নিয়ত। মুখে কোনো বিশেষ দোয়া বা আরবি বলা জরুরি নয়, তবে মনের ইচ্ছা থাকা আবশ্যক।
- বাংলা নিয়ত: “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তারাবির সুন্নাত নামাজ আদায়ের নিয়ত করছি। আল্লাহু আকবার।”
তারাবির নামাজের সঠিক নিয়ম
তারাবির নামাজের নিয়ম সাধারণ দুই রাকাত সুন্নাত নামাজের মতোই। নিচে ধাপগুলো দেওয়া হলো: ১. তাকবিরে তাহরিমা: আল্লাহু আকবার বলে হাত বাধা এবং ছানা পড়া। ২. সুরা তিলাওয়াত: সুরা ফাতেহার সাথে অন্য যেকোনো সুরা মেলানো। যারা হিফজ কুরআন শুনছেন (খতম তারাবি), তারা ইমামের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। ৩. রুকু ও সিজদা: স্বাভাবিক নামাজের মতো রুকু ও দুটি সিজদা সম্পন্ন করা। ৪. বৈঠক: আত্তাহিয়াতু, দরুদ শরিফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরানো। ৫. বিরতি: প্রতি ৪ রাকাত পর পর কিছু সময় বসে আরাম করা বা দোয়া পড়া মুস্তাহাব।
তারাবির নামাজের নিয়ম, গুরুত্ব ও ফজিলত
তারাবির নামাজের বিশেষ দোয়া
আমাদের দেশে ৪ রাকাত পর পর একটি দোয়া পড়ার প্রচলন আছে। আপনি চাইলে যেকোনো জিকির বা তাসবিহ পড়তে পারেন। বহুল প্রচলিত দোয়াটি হলো: “সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা যিল ইযযাতি ওয়াল আযমাতি ওয়াল হাইবাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়া-ই ওয়াল জাবারুত…”
তারাবির নামাজের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
তারাবির নামাজ জামাতে পড়ার প্রচলন শুরু হয় হযরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে কয়েক রাত এই নামাজ পড়েছিলেন, কিন্তু পরে এটি বাধ্যতামূলক হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি একা পড়া শুরু করেন। পরবর্তীতে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে ২০ রাকাত তারাবি জামাতে পড়ার ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বের মুসলমানরা অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে এই নামাজ আদায় করে আসছে। google
নারী ও পুরুষের তারাবির নামাজের পার্থক্য
অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে যে নারীরা কি তারাবির নামাজ পড়তে পারবেন? উত্তর হলো—হ্যাঁ। তবে নারীদের জন্য ঘরে একাকী নামাজ পড়া উত্তম। পুরুষদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামাজ পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কেফায়া। যদি এলাকার কিছু লোক মসজিদে জামাতে পড়ে, তবে সবার পক্ষ থেকে দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। তবে কেউ যদি কোনো ওজরবশত ঘরে একা পড়েন, তবে তার নামাজও হয়ে যাবে, যদিও তিনি জামাতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।
তারাবির নামাজের শারীরিক উপকারিতা
ইবাদতের পাশাপাশি তারাবির নামাজের বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ও শারীরিক উপকারিতা রয়েছে:
- হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য: ইফতারের পর ভারী খাবার খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়লে খাবার দ্রুত হজম হয়।
- মানসিক প্রশান্তি: দীর্ঘ সময় তিলাওয়াত শ্রবণ এবং সিজদাহ করার মাধ্যমে মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং মানসিক চাপ কমে।
- পেশি ও হাড়ের ব্যায়াম: তারাবির দীর্ঘ নামাজ বয়স্কদের জন্য হাড়ের জোড়া সচল রাখতে চমৎকার ব্যায়াম হিসেবে কাজ করে।
তারাবির নামাজ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন তারাবির নামাজ না পড়লে রোজা হবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। রোজা রাখা একটি ফরজ ইবাদত, আর তারাবি পড়া সুন্নাত। তবে তারাবি না পড়লে বিশাল সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই সামর্থ্য থাকলে কোনোভাবেই এই নামাজ মিস করা উচিত নয়।
তারাবির নামাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
- প্রশ্ন: তারাবি কি একা একা পড়া যায়?
- উত্তর: হ্যাঁ, তবে জামাতে পড়া অনেক বেশি সওয়াবের কাজ।
- প্রশ্ন: তারাবির পর বিতর কখন পড়তে হয়?
- উত্তর: তারাবির পর বা শেষ রাতে তাহাজ্জুদের পর বিতর পড়া যায়।





