সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা কি আমাদের শেকড়কে ভুলে যাচ্ছি? পড়ুন এক বৃদ্ধ বাবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের অপেক্ষার এক হৃদয়স্পর্শী গল্প ‘অপেক্ষার প্রহর‘। জীবনের আসল সার্থকতা খুঁজে পেতে আজই পড়ুন এই অসাধারণ কাহিনী।
অপেক্ষার প্রহর: একটি ফিরে আসার গল্প
গ্রামের শেষ সীমানায় যে বিশাল এবং প্রাচীন বটগাছটা দাঁড়িয়ে আছে, তার নিচে বসে প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখেন বৃদ্ধ রহমত চাচা। তার ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি বহু দূরে সেই মেঠো পথের বাঁকে আটকে থাকে। গ্রামের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে, কেউ বলে পাগল, কেউ বলে স্মৃতির কারিগর। কিন্তু রহমত চাচার তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি অপেক্ষা করছেন তার একমাত্র ছেলে সুজনের জন্য, যে দীর্ঘ ১৫ বছর আগে শহরে গিয়েছিল বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।
স্মৃতির জানলায় হারানো সেই সোনালী দিনগুলো
এক সময় রহমত চাচার জীবনটা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। তার ছোট একটি কুঁড়েঘর থাকলেও সেখানে ছিল হাসির কোলাহল। স্ত্রী হালিমা আর একমাত্র ছেলে সুজনকে নিয়ে তার ছোট কিন্তু সুখী এক সংসার ছিল। সুজন ছিল পড়াশোনায় খুব মেধাবী, গ্রামের স্কুলে তার নাম ডাক ছিল। রহমত চাচা অন্যের জমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতেন। বর্ষায় যখন মাঠ কাদা হয়ে যেত, তখনো রহমত চাচা কাজে যেতেন কেবল ছেলের একটা নতুন বই কিনে দেবেন বলে। রাতে হ্যারিকেনের মিটিমিটি আলোয় সুজন যখন পড়তে বসত, রহমত চাচা দূর থেকে ছেলের দিকে তাকিয়ে ভাবতেন—তার সব কষ্ট একদিন সার্থক হবে। এই স্বপ্নই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র জ্বালানি।
শহরের হাতছানি ও এক বিষন্ন বিচ্ছেদ
সুজন যখন কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল, তখন থেকেই তার মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করল। শহরের চকচকে জীবন তাকে গ্রামের ধুলোমাখা পথ আর রহমত চাচার জীর্ণ পোশাকের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি করে দিল। সুজন বুঝতে পারল, তার এই দারিদ্র্যের জীবন সে আর বইতে পারছে না। একদিন কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে সুজন কেবল একটি ছোট চিরকুট রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। তাতে লেখা ছিল— “বাবা, আমি বড় হতে চললাম। অনেক বড় হয়ে তোমাদের সব কষ্ট দূর করতে ফিরব।”
সেই যে সুজন গেল, রহমত চাচার জীবনের ক্যালেন্ডার যেন সেই ভোরেই থমকে দাঁড়াল। প্রথম কয়েক বছর সুজনের কোনো খবর ছিল না। হালিমা বিবি প্রতিটা দিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল। শেষে একদিন ছেলের পথ চেয়ে থেকে হালিমা পরপারে পাড়ি জমালেন। রহমত চাচা পুরোপুরি একা হয়ে গেলেন। কিন্তু তার বিশ্বাস এখনো অটুট—সুজন আসবেই। সে হয়তো এখন অনেক বড় কোনো অফিসে বসে, দামী গাড়ি চালায়, তাই ফিরতে দেরি হচ্ছে।
একাকীত্বের দহন ও নিভৃত বাস্তবতার লড়াই
গল্পের এই পর্যায়ে রহমত চাচার একাকীত্বের বর্ণনা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটবে। দিন যায়, মাস যায়, ঋতু বদলায়। বর্ষায় যখন মাঠ ভেসে যায়, তখন রহমত চাচা একলা ভাঙ্গা বারান্দায় বসে ভাবেন—শহরেও কি এত বৃষ্টি হচ্ছে? সুজন কি ভিজে যাচ্ছে? শীতে যখন হাড়কাঁপানো বাতাস বয়, তখন তিনি নিজের পাতলা চাদরটা মুড়ি দিয়ে ভাবেন—সুজনের কি গরম সোয়েটার আছে? এই যে নিঃস্বার্থ পিতৃস্নেহ, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য। রহমত চাচা কখনো সুজনের ওপর রাগ করেননি, কেবল তার দীর্ঘ প্রতীক্ষা তাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। প্রতিটা বিকেলের সূর্য যখন ডুবে যায়, রহমত চাচার হৃদয়েও এক একটা আশার প্রদীপ নিভে যায়, আবার পরের দিন ভোরের সূর্যের সাথে সেই আশা পুনরুজ্জীবিত হয়। Netfilx
হঠাৎ একদিনের সেই অচেনা আগন্তুক
গত পরশু বিকেলে যখন আকাশটা লাল হয়ে আসছিল, ঠিক তখন গ্রামে এক দামী কালো রঙের গাড়ি ঢুকল। গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে হৈচৈ পড়ে গেল। গাড়ি থেকে নামল এক সুঠাম যুবক। তার পরনে দামী স্যুট, চোখে রোদচশমা, হাতে দামী ঘড়ি। যুবকটি এসে সোজা রহমত চাচার জীর্ণ কুটিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রহমত চাচা তখনো সেই পুরনো বটতলায় বসে দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। যুবকটি ধীরে ধীরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন জল টলমল করছে। যুবকটি খুব ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকল— “বাবা!”
অপেক্ষার প্রহর: একটি ফিরে আসার গল্প
রহমত চাচা প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন হয়তো মনের ভুল। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন ডাকটি এল, তখন তিনি ধীরে ধীরে ফিরে তাকালেন। ১৫ বছরের ব্যবধান অনেক দীর্ঘ, কিন্তু একজন বাবার কাছে সন্তানের চেহারা কখনো আবছা হয় না। রহমত চাচা কোনো কথা বললেন না, কেবল তার শীর্ণ এবং কাঁপা হাত দুটো বাড়িয়ে দিলেন। সুজন আজ অনেক বড় মানুষ, তার অনেক টাকা, অনেক ক্ষমতা। কিন্তু বাবার সেই শীর্ণ দেহটা জড়িয়ে ধরে সে আজ বুঝতে পারল—পৃথিবীর সব ঐশ্বর্যের চেয়ে বাবার গায়ের সেই ঘাম আর মাটির গন্ধ অনেক বেশি দামী।
উপসংহার: জীবনের আসল সার্থকতা
জীবনের এই দীর্ঘ লড়াই শেষে সুজন ফিরে এলেও রহমত চাচা আজ বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন। সুজন তাকে শহরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু রহমত চাচা রাজি হননি। তিনি তার এই পুরনো ভিটেতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান। সুজন এখন নিয়মিত গ্রামে আসে। গ্রামের মানুষের কাছে সে এক আদর্শ। এই গল্পের মাধ্যমে আমরা শিখতে পারি যে, সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে যেন আমরা আমাদের শেকড়কে ভুলে না যাই। জীবনের আসল সার্থকতা বড় হওয়াতে নয়, বরং যারা আমাদের বড় করেছে তাদের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসায়।



